ঢাকা বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
96tvbd

সতীদাহ প্রথা-ইতিহাস, নিষ্ঠুরতা ও সমাজ সংস্কারের এক নির্মম অধ্যায়


৯৬ টিভি | আব্দুর রহিম জুন ৩, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম সতীদাহ প্রথা-ইতিহাস, নিষ্ঠুরতা ও সমাজ সংস্কারের এক নির্মম অধ্যায়

মানব সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু সামাজিক প্রথা রয়েছে, যা আজকের দৃষ্টিতে শুধু অমানবিক নয়, বরং সভ্যতার জন্য কলঙ্ক হিসেবেও বিবেচিত। সতীদাহ প্রথা ছিল তেমনই এক নিষ্ঠুর ও বর্বর সামাজিক প্রথা, যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে একই চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো অথবা আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করা হতো। “সতী” শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ “পতিব্রতা স্ত্রী”। একসময় সমাজের একটি অংশ এটিকে নারীর স্বামীভক্তি ও ধর্মীয় আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে এটি ছিল নারীর মানবাধিকার ও স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।
ইতিহাসবিদদের মতে, সতীদাহ প্রথার সূচনা প্রাচীন ভারতে হলেও এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে মধ্যযুগে। প্রায় পঞ্চম থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে এর প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। মধ্যপ্রদেশের এরান অঞ্চলের ৫১০ খ্রিস্টাব্দের একটি শিলালিপিতে এক নারীর স্বামীর চিতায় আত্মাহুতির উল্লেখ রয়েছে, যা সতীদাহের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রথমদিকে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল; পরবর্তীতে কিছু অঞ্চলে এটি সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথায় পরিণত হয়।


সতীদাহ প্রথা পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে সমানভাবে প্রচলিত ছিল না। বাংলা অঞ্চল, বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার এবং নেপালের কিছু অংশে এর ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। বিশেষ করে রাজপুত সমাজে এই প্রথা গভীরভাবে প্রচলিত ছিল। যুদ্ধের সময় নারীদের গণআত্মাহুতি “জহর” নামেও পরিচিত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সতীদাহের ঘটনা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে ব্রিটিশ প্রশাসন বাধ্য হয়ে এর পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু করে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৮১৫ থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাতেই প্রায় ৮,০০০-এর বেশি নারী সতীদাহের শিকার হন। তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েক দশ হাজার নারী এই প্রথার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতেন না; বরং সামাজিক চাপ, ধর্মীয় ভয়, পারিবারিক জোরজবরদস্তি, সম্পত্তি দখলের স্বার্থ এবং বিধবা জীবনের কঠোর বাস্তবতা তাদেরকে এই নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দিত।
সতীদাহ প্রথা সমাজে নারী-পুরুষ বৈষম্যকে আরও গভীর করে তোলে। একজন নারীর ব্যক্তিসত্তা, স্বাধীনতা ও জীবনের মূল্যকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হতো। বিধবা নারীদের সমাজে অবহেলা, অপমান ও কষ্টকর জীবনযাপনের মধ্যে রাখা হতো, যেন মৃত্যুকেই তাদের জন্য “সম্মানজনক” পথ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা এবং কুসংস্কার এই প্রথাকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।


তবে সমাজে প্রতিরোধও গড়ে ওঠে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন শুরু করেন। তিনি মানবিক, যুক্তিবাদী ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় প্রথা নয়। তাঁর আন্দোলন এবং জনমত গঠনের ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এটি ছিল ভারতীয় সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, তবুও মাঝে মাঝে কিছু উগ্র ও রক্ষণশীল গোষ্ঠী এটিকে “ঐতিহ্য” হিসেবে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেছে। ১৯৮৭ সালে ভারতের রাজস্থানে রূপ কানোয়ার-এর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে যে তাকে সতীদাহে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর ভারত সরকার আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করে এবং সতীদাহকে উৎসাহিত করা বা প্রচার করাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে।
আজ সতীদাহ প্রথা শুধু ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুর অধ্যায় নয়; এটি মানবাধিকারের গুরুত্ব, নারী স্বাধীনতা এবং সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার একটি কঠিন শিক্ষা। কোনো সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সমানভাবে মূল্যায়িত হয়। সতীদাহের ইতিহাস আমাদের সেই মানবিক শিক্ষাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক-
আব্দুর রহিম
“পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্র্যাকটিশনার”

Side banner